রবিবার ১৪ জুন ২০২৬
Online Edition

আল্লাহর আরশ ও কুরসী এবং আধুনিক বিজ্ঞান

মনসুর আহমদ : পবিত্র কালামে পাকে আল্লাহর আরশ ও কুরসীর কথা এসেছে। কিন্তু এর স্বরূপ, ব্যাপ্তি ও প্রসারতা সম্পর্কে তেমন কিছু বলা হয়নি। সূরা বাকারায় বলা হয়েছে, “ওয়াসেয়া কুরসীউয়ুহুস সামাওয়াতে ওয়াল আরদে ওয়া লা ইয়া উদুহু হিফ্জুহুমা ওয়া হুয়াল আলিয়ুল আজিম। (২৫৫)- তাঁর সিংহাসন (কুরসী) সমস্ত আসমান এবং জমিনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলিকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। 
আরশের কথা এসেছে কোরআনের বেশ জায়গায়। যেমন - ইন্না রব্বাকুমুল্লাহুল্লাজী খালাকাস্ সামাওয়াতে ওয়াল আরদা ফি সিত্তাতে আইয়ামেন ছুম্মাস্তাওয়া আলাল আরশে ... (আল আরাফ- আয়াত ৫৪; সূরা ইউনুস -৩)-নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্। তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
আর রহমানু আলাল আরশেস্ তাওয়া- (তাহা আয়াত- à§«) অর্থৎ তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমাসীন হয়েছেন। ইংরেজীতে এর অর্থ করা হয়েছে- The most Gracious (Allah) rose over (Istawa) the (mighty) Throne (in a manner that suits His Msjesty). (The Noble Qur’an - Dr, Muhammad TaQi –ud-Din Al- Hilali)
আর রহমানু আলাল আরশেস্ তাওয়া”- অর্থৎ তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমাসীন হয়েছেন।  এ আয়াত প্রসঙ্গে তাফসীরে মাআরেফুল  কোরআনে লেখা হয়েছে, “( আরশের উপর সমাসীন হওয়া ) সম্পর্কে পূর্ববর্তী বুযুর্গ গণের উক্তি হচ্ছে যে, এর স্বরূপ ও অবস্থান কারও জানা নেই। এটা “মুতাশেবিহাত” তথা দুর্বোধ্য বিষয়াদির অন্যতম । এরূপ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আরশের উপর সমাসীন হওয়া সত্য। এ অবস্থা আল্লাহ্র শান অনুযায়ী হবে। জগতের কেউ উপলদ্ধি করতে পারেবে না।”
কুরসী বলতে কী বুঝায়? মওলানা আকরম খাঁ তাঁর তাফসীর গ্রন্থে লিখেছেন:- “আয়াতে “কুরছী” শব্দের উল্লেখ আছে । ইহার দুই প্রকার অর্থ হয়- আসন বা জ্ঞান। (রাগেব)।  এবন- আব্বাছ এখানে জ্ঞান অর্থ গ্রহণ করিয়াছেন (বোখারী)। এবন জরীর এই মতকে অধিক সঙ্গত বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন (তাফছীর।) । যাঁহারা আসন অর্থগ্রহণ করিয়াছেন, তাঁহারাও শব্দটাকে নিছক উপমা বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। তাঁহারা ইহাও স্বীকার  করিয়াছেন যে, “প্রকৃত পক্ষে বাস্তবে কোন আসন নাই। , আর তাহার উপর উপবেশনকারীও  কেহ নাই।”
কুরসীর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তাফসীরে মাআরেফুল  কোরআনে লেখা হয়েছে: কুরসী এত বড়, যার মধ্যে সাত আকাশ ও যমিন পরিবেষ্টিত রয়েছে। আল্লাহ্ উঠা-বসা আর স্থান- কধর থেকে মুক্ত। এ ধরনের আয়াতকে মানুষের কার্যকলাপ ও আচার  আচরণের সাথে তুলনা করা উচিত নয় । এর অবস্থা  পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করা মানব জ্ঞানের ঊর্ধ্বে।” 
আল্লাহ্র যথার্থ মর্যাদা নিরূপণ করা মানুষের পক্ষে যেমন সম্ভব নয়,  তেমনি আরশ ও কুরসীর ব্যাপারেও কোনো ধারণা করা মানুষের সাধ্যের সীমাতীত। তবে এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যা বলেছেন তার উপরে ইয়াকীন রাখতে হবে । 
হযরত ইবনে যায়েদ বলেন, আবুযর (রাঃ) বলেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে বলতে শুনেছি: আরশের মধ্যে কুরসীর অবস্থান হচ্ছে ঠিক ভূপৃষ্ঠের কোনো উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকা একটি আংটির মতো। 
হযরত ইবনে যায়েদ বলেন, “আমার পিতা আমাকে বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন, কুরসীর মধ্যে সপ্তাকাশের অবস্থান ঠিক যেন একটি ঢালের মধ্যে সাতটি দিরহামের মত”
উপরোক্ত হাদিস দু’টিতে “আরশ” এবং “কুরসী”র বিরাটত্ব ও ব্যাপকতার যে কথা রয়েছে তা বর্তমান কালের জ্ঞান বিজ্ঞান দিয়ে বিশ্লেষণ করলে ধারণা আরও সচ্ছ হবে।
এবার আসা যাক মহাবিশ্বের বিস্তৃতি প্রসঙ্গে। মহাবিশ্বের বিস্তৃতি মানুষের গবেষণা লব্ধ জ্ঞানের বাইরে। ড. হাবল অনুমান করেছেন যে, সমগ্র মহাশূন্য প্রায় এক সহস্র মিলিয়ন গুণ বেশী, মাউন্ট উইলসন-এ স্থাপিত অতিকায় দূরবিনে যতটা অংশ দৃশ্যমান হয় তার একটি বড় অংশের সমান। এই দূরবিনে আমাদের নক্ষত্র ব্যবস্থার বাইরে প্রায় দুই বিলিয়ন নেবুলা (নিহারিকা) আবিষ্কৃত হয়েছে। আলোর  বেগে সমগ্র বিশ্ব লোকের চতুর্দিকে ভ্রমণ করতে লাগবে এক লক্ষ বিলিয়ন বছর।
আমাদের নক্ষত্র জগতের একটা সুদীর্ঘ ব্যাস রয়েছে, যা পরিভ্রমণে আলোর জন্য অন্তত ৩০০০০০ (তিন লক্ষ) আলোক বর্ষের প্রয়োজন। আমাদের সূর্য সমগ্র ব্যবস্থার কেন্দ্র স্থল থেকে প্রায় ৬০০০০ আলোক বর্ষ দূরে অবস্থান করছে। মহা বিশ্বের বিস্তৃতি অনুমান করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। মহাবিশ্বে বহু সংখ্যক নক্ষত্র এমন যে , সে সবের আলো আমাদের পর্যন্ত পৌঁছতে ৫০০০০ আলোকবর্ষ অতিবাহিত হয়। অনেকগুলো প্রথম সৃষ্টি মুহূর্ত থেকে আমাদের দিকে আলো পাঠাতে শুরু করেছে, কিন্তু এখন পর্যন্তও তা আমাদের নিকট এসে পৌঁছেনি। মহাশূন্যের ছায়াপথ পুঞ্জে ১৯ টি ছায়াপথ বিরাজ করছে। এ পর্যন্ত এই  সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। এগুলো মহাশূন্যের যে অংশ দখল করে রয়েছে তার ব্যাসের দৈর্ঘ্য ১০০০০০০[ দশলক্ষ] পারসিক। (এক পারসিক সমান ১৯২ী১০১১ মাইল।) তার অর্থ স্থানীয় ছায়পথ সমষ্টি যে ক্ষেত্রটি দখল করে আছে, তার ব্যাস ১৯২ী১০১৭ মাইল। আমাদের  ছায়া পথ একলাই ১৩ী১০১১ নক্ষত্র শামিল করে রেখেছে। [à§§]     
আমাদের সৌরজগৎ যে ছায়াপথে অবস্থিত তার বিনস্তৃতিও অনেক। আমাদের সৌরজগত থেকে ছায়া পথের কেন্দ্রের দূরত্ব ২৫ হাজার আলোক বর্ষ, তেমনি ছায়া পথের শেষ প্রান্তের দূরত্ব  একই ভাবে ২৫ হাজার আলোক বর্ষ। অর্থাৎ গোলাকার ছায়া পথের ব্যাস এক লক্ষ অলোক বর্ষ। ছায়া পথের  তুলনায় সৌর জগতের আয়তন গোটা ইউনাইটেড স্টেটের তুলনায় আমেরিকান একটি মূদ্রার সমান।
“আমাদের এই পৃথিবী যে সৌরলোকে অবস্থিত তা এতই বিরাট ও বিশাল যে, উহার কেন্দ্র-এই সূর্য আকারে পৃথিবীর তুলনায় তিন লক্ষ গুণ বড়। তার দূরতম গ্রহ নেপচুন সূর্য থেকে অন্তত ২ শত ৭৯ কোটি ৩০ লাখ মাইল দূরে অবস্থিত। আর প্লুটোকে যদি দূরতম নক্ষত্র ধরা হয়, তবে তা সূর্য থেকে ৪ শত ৬০ কোটি মাইল দূরে অবস্থিত । এই বিরাটত্ব ও বিশালতা সত্ত্বেও এ সৌর লোক আরও অনেক বড় ছায়াপথের একটা ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া কিছু নয়। যে ছায়াপথে আমাদের এই সৌরলোক অবস্থিত তাতে প্রায় তিন হাজার মিলিয়ন (তিন শত কোটি) সূর্য রয়েছে। এর নিকটতর সূর্য আমাদের এই পৃথিবী হতে এতখানি দূরে অবস্থিত যে,তার আলো এখানে পৌঁছতে ৪ কোটি বছর অতিবাহিত হয়। বলাবাহুল্য এই ছায়া পথই সমগ্র বিশ্বলোক নয়, বর্তমান কালের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়েছে যে এটি প্রায় ২০ লাখ নীহারিকা পুঞ্জের মধ্যে মাত্র একটি। তন্মধ্যে নিকটবর্তী নিহারিকা আমাদের থেকে এত বেশী দূরত্বে অবস্থিত যে, তার আলো দশ লক্ষ বছরে আমাদের এই জমিনে এসে পৌঁছে। আর দূরবর্তী যে সব গ্রহ- উপগ্রহ আমাদের বর্তমান যন্ত্রপাতিতে ধরা পড়ে তার আলো পৃথিবীতে পৌঁছতে দশ কোটি বছর প্রয়োজন।” [২]  সব চাইতে দূরের ছায়াপথের দূরত্ব  এক হাজার ৩২০ কোটি আলোক বর্ষ। নাসার বিজ্ঞানিরা এটিকেই সবচেয়ে দূরের গ্যালাক্সি বলে নিশ্চিত করেছেন। যুক্ত রাষ্ট্রের জন হপকিংস  ইউনিভার্সিটির পদার্থ বিজ্ঞান  ও জ্যেতির্বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক উই জেন বলেন, “আমাদের খুঁজে পাওয়া  সবচেয়ে দূরের  গ্যালাক্সি এটি।”
বিজ্ঞানের এসব তথ্য সামনে থাকার পর রাসূল (সাঃ) কর্তৃক প্রদত্ত আরশ ও কুরসীর বিরাটত্ব সম্পর্কে ধারণা ঈমানের জন্য অধিকতর সহায়ক হবে আশা করি। রাসূল (সাঃ) যে খবর দিয়েছেন তা বিজ্ঞানের অগ্র যাত্রার সাথে  সাথে অধিকতর স্বচ্ছ হয়ে উঠবে। তাই মুসলমান বিজ্ঞানীদের উচিত আল্লাহ্র সৃষ্টি জগত সম্পর্কে অধিকতর ভাবে গবেষণা চালিয়ে যাওয়া।  
তথ্য :
à§§]  স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্ব- মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহীম
২]  তাফহীমুল কোরআন- সূরা ইয়াসীন, টিকা- à§©à§­

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ